“অতি সন্যাসে গাঁজন নষ্ট আর অতি আদরে সন্তান নষ্ট।“
শৈশবে মুরব্বীদের মুখে শুনতাম আর ভাবতাম, এ কেমন কথা? সন্তাঙ্কে তার পিতা মাতা আদর করবে না, তাই কি হয়? কিন্তু আদরের আগে “অতি” কথাটা রয়েছে যে, সেটা বুঝতাম না।
বাস্তবে যখন দেখি আমার সন্তান ভালো কিছু করছে, খুবই ভালো লাগে। কিন্তু যখন দেখি কারো আদরের কোনো সন্তান নিজের বাবা মা এর সাথে চরম বেয়াদবী করে তখন খুবই কষ্ট লাগে। মা বাবা কত কষ্ট করে সন্তানকে সযত্নে মানুষ করার চেষ্টা করে। প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে। প্রতিষ্ঠিত হয়ে যখন তারা তাদের মা বাবাকে ভুলে যায় সেটা বোধ করি আরো কষ্টের, ঐ মা বাবার কাছে। কিন্তু তবুও সেই মা বাবা তাদের সন্তানের অমঙ্গল চায় না। স্নেহের সন্তান বড় হয়ে তার বাবা মাকে অযত্ন, অবহেলা করে, খোঁজ খবরও নেয় না, এমনকি মা বাবাকে খুন পর্যন্ত করেছে, এর ভুরি ভুরি প্রমাণ রয়েছে এ সমাজে।
মা বাবা সন্তানের জন্ম দিলেও তাকে মানুষের মত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষক সমাজের ভূমিকাই সর্বাধিক।
কবি বলেছে- দোসরা জনম দিলা শিক্ষা গুরু। অর্থাৎ সন্তানকে দ্বিতীয়বার জন্ম দিলেন শিক্ষক। তাই মানুষের জীবনে বাবা মা’র পরেই হচ্ছে শিক্ষকের স্থান। শিক্ষকের মর্যাদা সর্বদাই উপরে থাকার কথা। কিন্তু বড় পরিতাপের বিষয় হচ্ছে,বর্তমান সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা সেভাবে অক্ষুন্ন নেই। শিক্ষকদের স্থে অসদাচরণের মাত্রা দিনে দিনে তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। যদিও শিক্ষকেরা ভুলের ঊর্ধে নন। কিন্তু তার পরেও আমাদের উচিৎ শিক্ষকদের সম্মান করা।
এব্যাপারে পারিবারিক শিক্ষার গুরুত্ব অপ্রিসীম। পরিবার থেকেই শিক্ষকের মর্যাদা কিভাবে দিতে হয় তা একজন শিশুকে বুঝাতে হবে। বড় হয়ে যেন কোনো শিশু তার শিক্ষক তথা শিক্ষক সমাজকে সম্মান করে বা উপযুক্ত মর্যাদা দেয় সেটা পরিবার থেকেই শিখাতে হবে।
আমাদের সমাজে কিছু শিক্ষক নামধারী লোভী ব্যক্তি রয়েছেন, যারা সমগ্র শিক্ষক সমাজকে কলংকিত করে থাকেন। অবশ্য এরকম লোকের সংখ্যা অতি নগণ্য। তদুপরি সমাজে শতভাগ মানুষই যে ভালো হবে তার কোনো মানে নেই। ভালো মন্দ মিলে সমাজ।
এবার আসি মূল কথায়। অতি সম্প্রতি পত্র পত্রিকাসহ সোস্যাল মিডিয়ার বদৌলতে শিক্ষার্থী কর্তৃক শিক্ষকের গায়ে হাত তোলার মত ঘটনা তুমুল ভাইরাল হয়েছে। এরকমটি এর আগেও অনেক অনেক হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় এরকম বহু নিউজ এসেছে বিগত দিনে। পরীক্ষায় অসদুওয়ায় অবলম্বন করতে না দেওয়ায় অনেক শিক্ষককে লাঞ্ছিত হতে হয়েছে, এমনকি জীবনও দিতে হয়েছে অনেক শিক্ষককে। এর চেয়ে বেদনাদায়ক আর কি হতে পারে?
মানুষ গড়ার কারিগর হচ্ছেন শিক্ষক। প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য একজন শিক্ষক অনেক সময় শিক্ষার্থীর প্রতি কঠোর হবেন, আবার তাদের আদর, স্নেহ-মমতায় ভরিয়ে তুলবেন এটাই তো হওয়া উচিৎ।
কিন্তু বর্তমান সমাজে আমরা কি দেখছি?শিক্ষার্থীদের শাসন করা যাবে না,এমনকি তাদেরকে চোখ রাঙানোও যাবে না। এতে নাকি তাদের মেধার বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়! সরকারি স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে এব্যাপারে, কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বেতের লাঠি পর্যন্ত থাকতে পারবেনা। শিক্ষার্থীদের ভালোবাসতে হবে, আদর করতে হবে। তাদের শাসন কর যাবে না। এতে আসলেই কি শিক্ষার্থীরা উপকৃত হচ্ছে? না কি উল্টো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে? একটু ভেবে দেখা দরকার।
শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের ভালবাসতে বাসতে এক পর্যায়ে নিজ ঘরে নিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে মেয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এসব হচ্ছে বেশী। ছেলে মেয়েদের মধ্যে অবাধ মেলা মেশার কুফল ছড়িয়ে যাচ্ছে যত্রতত্র। অবৈধ সন্তানের মা হচ্ছে অবিবাহিতা কিশরীরা। গর্ভপাতের মত ঘটনাও ঘটছে অহরহ। নিজেদের মান সম্মান, ইজ্জতের ভালাই নাই এখন সমাজে। ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে সমাজের আনাচে কানাচে অনৈতিক কর্মকান্ডের ছড়াছড়ি। খুন খারাবি, ধর্ষণ, রাহাজানি এখন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার মাত্র। কেউ কেউ এটাকে আবার বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখেন। তারা সমাজপতি, সব কিছুতেই তাদের মতি! তাদের কথা অমান্য করলে সমাজে বাস করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
কিশোর গ্যাং এখন সমাজের একটা গলার কাটা হয়ে দাড়িয়েছে। পাড়া-মহল্লায় যেখানে সেখানে উঠতি বয়সী কিশোরদের আড্ডায় ভরা। যে বয়সে তাদের হাতে কেবল বই খাতা থাকার কথা, সেখানে এখন তাদের হাতে শোভা পাচ্ছে এন্ড্রয়েড মোবাইল, দামী সিগারেট আর মারাত্মক সব অস্ত্রপাতি। ছিনতাই, ছুরিকাঘাতে হত্যাসহ নানবিধ অপ্রাধ মূলক কর্মকান্ড বেড়েই চলেছে ব্যাপক হারে।
তবে যেদিন থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হতে শাসন উঠে গেছে, সেদিন হতেই আসলে সমাজ থেকে আদব কায়দা বিলীন হয়ে গেছে। এটা চরম সত্যি। এটা কেউ মানুক বা না মানুক, কিচ্ছু এসে যায় না। তবে এটাই বাস্তবতা, কঠিন বাস্তবতা।
এখন থেকেই যদি প্রতিরোধ করা না যায় তবে এমন একটা সময় আসবে যখন সমাজের শান্তি শৃংখলার চরম অবনতি ঘটবে, সেখান থেকে ফিরে আসার পথ সুগম হবেনা মোটেই।
তাই আমদের উচিৎ, পরিবার থেকেই সন্তানকে সু শিক্ষায় শিক্ষিত করার মানসিকতা তৈরী করা। যেনো আমরা আমাদের ভবিষ্যত বংশধরদের জন্য একটা শান্তিময় বিশ্ব রেখে যেতে পারি।
এটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত মতামত। জানি অনেকের কাছেই আমার এই মত গ্রহণযোগ্য নয়। আমার সাথে তাদের দ্বিমত থাক্তেই পারে। কিন্তু দিনের শেষে একটাই চাওয়া – সমজে যেনো শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। আর কিছু না। অশান্তি আমরা চাই না।
পসাম্প্রতিক ছাত্র কর্তৃক শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। সাথে সাথে প্রশাসনের কাছে অপরাধীর উপযুক্ত বিচার দাবী করছি।
লেখক- কলমযোদ্ধা।